Breaking News
Home / উপসম্পাদকীয় / Interviews & Artcles / ওরা মানুষ না ! – মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা
চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি

ওরা মানুষ না ! – মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা

[সাক্ষাৎকার] ওরা মানুষ না!ওদের শরীরে রক্ত- মাংস নেই,ওরা ডাল-ভাত খায় না,ওরা গরু-ছাগল ও না,ওদের জন্য ঘাস ও বরাদ্দ নেই।তাহলে ওরা কারা?কি ওদের পরিচয়?
ওরা হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের বদলী ও সাধারণ শ্রমিক।বছরের পর বছর পাটকলে কাজ করেও ওদের চাকরি স্থায়ী হয়নি।কাজ করতে গিয়ে ও বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক নেতাদের টাকা দিয়ে নিজেদের নায্য পাওনা বুঝে নিতে হয়।বদলী ও সাধারণ শ্রমিকেরা অধিকাংশই জন্ম ও পরিবারের সূত্র ধরেই এই পেশায় জড়িয়ে পড়েছে।এক সময় বাবা,চাচা,মা,খালারা শ্রমিক ছিল তারা বৃদ্ধ হওয়ার ফলে তাদেরই সন্তানদের অনেকেই এ পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।এখন সবকিছুই শেষ! যে সমস্ত তরুণ বদলী ও সাধারণ শ্রমিক হিসেবে পাটকলে চাকরি করে,তাদের অধিকাংশই মিলের কলোনীতে জন্মগ্রহণ করেছেন।শিশুবেলা থেকেই পাটকল ও পাটকল শ্রমিকদের সাথে তাদের রক্তের বন্ধন।



সরকারের একটি সিদ্ধান্তে বদলী ও সাধারণ শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা একবার ও সরকারপ্রধান ভেবে দেখেছেন?বন্ধ হওয়া প্রতিটি পাটকলের সামনে শ্রমিকদের বুক ফাটা চিৎকার,কান্না আর রক্তক্ষরণের শব্দে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সেই মূহুর্তে ও কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে ব্যানার তৈরি করে পাটকল বন্ধ ঘোষণায় আনন্দ মিছিল করেছে।এ যেন ছোপ ছোপ রক্তের ওপর নগ্ন পায়ের নৃশংস চিহ্ন।কেউ কি মৃতের বাড়িতে গিয়ে অট্টহাসি দিয়েছে, এই দৃশ্য বা সংবাদ শুনেছেন বা দেখেছেন?যখন পাটকল শিল্পনগরী মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়েছে,তখন এই সব দৃশ্যও আমরা দেখতে পাই।দলকানার রাজনীতিতে আমাদের বিবেক,মানবিকতা, নীতি,আদর্শ সবকিছুই লোপ পেয়েছে।শ্রমিকদের পক্ষে যখন কোনো কিছু লিখে পোস্ট দেয়া হয়,তখন দলকানাদের কেউ কেউ মন্তব্য করে বলেন, “আমাদের নিয়ে রাজনীতি করবেন না”। শ্রমিক ভেবে মন্তব্যকারীর প্রোফাইলে ডুকলেই দেখা যায়,টাইমলাইনে নিজের বা বাবার ছবির পরিবর্তে আদর্শিক নেতার ছবি দিয়ে প্রোফাইল সাজিয়েছে।তিনি যে শ্রমিক এই চিহ্ন ও তার প্রোফাইলে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।এমন প্রহসন আর প্রতারণা ও আমাদের দেখতে হয় অন্ধ রাজনীতির কারণে।করোনাকালীন এই মহাদূর্যোগেও,কোন কোন শ্রমিক নেতা সরকারের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু,বদলী ও সাধারণ শ্রমিকদের পক্ষে একটি কথা ও বলেননি।অথচ,রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের দুর্নীতির উৎস খুঁজলেও এখন যারা বড় বড় কথা বলছে ও সরকারের পক্ষে সাফাই গাইছে তাদের সম্পদের হিসাব খুঁজলেও বড় বড় রুই কাতলা বেরিয়েও আসতে পারে।



যে সমস্ত বদলী ও দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক সরকার ঘোষিত সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন,তাদের সাথে তাদের পরিবার ও রয়েছে।সরকার ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিকদের পাওনাদি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, প্রথমে অর্ধেক ও বাকিটা সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে।সরকার এইক্ষেত্রে স্থায়ী শ্রমিকদের এককালীন টাকা একসাথে বুঝিয়ে না দিলেও তাদের ও দুর্গতির সীমা থাকবে না।বাকি বদলী ও দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিকদের সংখ্যাও চল্লিশ -পঞ্চাশ হাজার।প্রত্যেককেই শূন্যহাতে বাড়ি ফিরতে হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের সন্তানরা হবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।তাদের লেখাপড়া মুখথুবড়ে পড়ে যাবে,নষ্ট হয়ে যাবে তাদের সোনালী ভবিষ্যৎ।স্থায়ী বা অস্থায়ী শ্রমিকরা জীবনের অধিকাংশই সময় পাটকলের সাথে জড়িয়ে থাকায়,তাদের বর্তমান ভবিষ্যৎ ছিল এই পাটকলকে ঘিরেই।দুই ঈদ দুবার গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যেতেন,অনেকেও তাও যেতেন না,এখানেই ঈদের আনন্দ সকলের সাথে ভাগ করে নিতেন।শ্রমিকরা যে আয় করতেন,তাতে সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়েছিল,সন্তানদের লেখাপড়া জোড়াতালি দিয়ে করাতেন।যাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি গ্রামে নেই কিংবা যৎসামান্য আছে কেউ কেউ পরিবারকে বাড়িতে রেখে এসে এখানে একা চাকরি করলে তাদের থাকার জন্য কিছু ঘরবাড়ি আছে।
কিন্তু যারা পরিবার পরিজন নিয়ে যুগের পর যুগ এখানে কাটিয়েছেন,সেই সমস্ত অধিকাংশ শ্রমিকদের বাড়িতে নিজস্ব ঘরবাড়ি নেই।যারা স্থায়ী শ্রমিক তারা সরকার কর্তৃক যে সুযোগ সুবিধা পাবে,সেই টাকা নিয়ে বাড়িতে গিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করে,যে টাকা অবশিষ্ট থাকবে তা দিয়ে অন্য কিছু করার সুযোগই থাকবে না।কিন্তু, যারা বদলী ও সাধারণ শ্রমিক তারা কীভাবে তাদের বাড়িতে গিয়ে ঘর তৈরি করে থাকবে।পরিবার – পরিজন নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তারা?



করোনাকালীন মহাদূর্যোগে,প্রতিটি মানুষ নিজে কীভাবে বাঁচবে সেই চিন্তায় অস্থির।সেই মুহূর্তে অসহায়,অর্থহীন সদ্য বেকার হওয়া শ্রমিকদের পাশে কে দাঁড়াবে?এতে সমাজে নানানভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে।হু হু করে শিশুশ্রম বৃদ্ধি পাবে,অন্যদিকে কেউ কেউ অনৈতিক পথ বেছে নিবে।হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যাবে।এর দায়ভার কে নেবে?
বর্তমান সরকার নিজেদেরকে শ্রমিকবান্ধব সরকার হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে।বিভিন্ন সময় বন্ধ পাটকল খুলে দেয়ার ও অঙ্গীকার করেছিলেন।এবং ক্ষমতাসীন থাকা বিভিন্ন পাটকল খুলেও দিয়েছিলেন।বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায়, আদমজী সহ অনেক পাটকল বন্ধ ঘোষণা করেছিলেন।এর সে কারণেই বর্তমান সরকারের প্রতি পাটকল শ্রমিকদের আশা বেশি ছিল।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তিনি তো মানবতার মা।দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্র‍য় দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তিনি নন্দিত হয়েছেন।সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থাশীল। তাঁকে ভালবাসে,বিশ্বাস করে ও শ্রদ্ধা করে।সেই শ্রমিকদের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতি সদয় না হয়ে,কেন তিঁনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন?তিঁনি তো বঙ্গবন্ধুর কন্যা। বঙ্গবন্ধু তো সবসময় অসহায় মানুষের কথা বলতেন,তাদের পাশে দাঁড়াতেন।



কি এমন ঘটনা ঘটলো,বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে এবং করোনাকালীন মহাদূর্যোগে একসাথে সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে দিতে হল।অথচ, বেসরকারি পাটকল থেকে মালিকেরা ব্যাপক মুনাফা অর্জন করছে।তবে কেন বছরের পর বছর রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল লোকসানের মুখ দেখছে? রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের লোকসানের কারণ খুঁজে বের না করে,বার বার অসহায় শ্রমিকদেরকেই বঞ্চিত করা হচ্ছে।সোনালী আঁশ এখন কেনই বা গলার ফাসে পরিনত হচ্ছে?বিজিএমসি এবং পাটকলে থাকা কিছু দুর্নীতিবাজ প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদী শ্রমিকনেতাদের কারণেই এ খাতে বছরের পর বছর লোকসান গুনতে হচ্ছে।প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কেন অসহায় শ্রমিকদের পথে বসানো হচ্ছে?এখনো সময় আছে, ফিরে আসুন সম্ভাবনাময় খাত, সোনালী আঁশ যেন কারো গলার ফাঁস না হয়।

লেখক – মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা
যুগ্ম আহ্বায়ক, কৃষক-শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন
চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি

 

আরো সংবাদ পড়ুন :                                       খালেদ হাসান, সিনিয়র রিপোর্টার

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com